Monday, February 5, 2018

মাদক ও আমাদের সমাজ

বর্তমান সময়ে একটি সর্বগ্রাসী সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে মাদক। এটি একটি দেশ বা সমাজের অন্যতম মারাত্মক সমস্যা। বিশেষত আমাদের যুবসমাজের জন্য মাদক ও মাদকাসক্তি মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদকদ্রব্যের ব্যবহার ও চোরাচালান সমস্যা দেশ-কাল, ধর্ম-বর্ণ, সমাজ নির্বিশেষে আজ সারা বিশ্বকে গ্রাস করছে। ধনী-দরিদ্র, উন্নত-উন্নয়নশীল কোনো দেশই মাদক সন্ত্রাস থেকে মুক্ত নয়। প্রতিনিয়ত এর বিষাক্ত ছোবলে আক্রান্ত হচ্ছে অসংখ্য সম্ভাবনাময় জীবন। সমাজের যাবতীয় পাপাচার, অন্যায়, বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতার অধিকাংশের মূলেই রয়েছে এই মাদক ও মাদকাসক্তি। ইসলাম এই মাদক ও মাদকাসক্তির ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট সমাধান এবং পালনীয় নীতিমালা প্রদান করেছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ (ভাগ্য-নির্ধারক শর বলতে আরবে প্রচলিত এক ধরনের জুয়া বোঝানো হয়েছে) এসব শয়তানের কাজ বৈ অন্য কিছু নয়। অতএব, এগুলো থেকে দূরে থাক; যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও (সুরা মায়িদা-৯০)।

পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে মাদক ও সংশ্লিষ্ট সবকিছুকে শয়তানের জঘন্য কাজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং এও বলা হয়েছে যে, মাদক মানুষের মাঝে শত্রুতা ছড়িয়ে দেয়। বর্ণিত আয়াতে মাদকের আরেকটি ভয়াবহ পরিণতির কথা বলা হয়েছে, মাদক মানুষকে মহান আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। আর যখন কোনো মানুষ সম্পূর্ণভাবে আল্লাহবিমুখ হয়ে যায়, তখন তার মাঝে নীতি-নৈতিকতা বলতে কিছু অবশিষ্ট থাকে না। হযরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস, ‘রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, সকল নেশা জাতীয় দ্রব্যই খমর তথা মদের অন্তর্ভুক্ত। আর সব ধরনের মাদকই হারাম।’ (মুসলিম)। আবদুল্লাহ বিন উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, যদি কেউ মদপান করে, আল্লাহ তার চল্লিশ দিনের নামাজ কবুল করেন না। আর যদি এ অবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করে; তবে সে জাহান্নামি হবে। কিন্তু যদি সে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, আল্লাহ তায়ালা তাকে ক্ষমা করে দেবেন। এরপর যদি দ্বিতীয়বার মাদক গ্রহণ করে তাহলে তার চল্লিশ দিনের নামাজ কবুল হবে না। তবে যদি দ্বিতীয়বার তওবা করে, আল্লাহ তওবা কবুল করবেন। এরূপ যদি চতুর্থবার সে পুনরায় মদপান করে, তাহলে আল্লাহ তায়ালার ওপর হক হয়ে যায় যে তিনি তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন।’

হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস রয়েছে, ‘রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, মদ সব অশ্লীলতার মূল ও মারাত্মক কবিরা গুনাহ। এও বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি মদপান করল সে যেন আপন মা, খালা ও ফুফুর সঙ্গে অপকর্মে লিপ্ত হলো।’ (তবরানি)। মদের কুফল বর্ণনার ব্যাপারে এর চেয়ে মারাত্মক কথা আর কী হতে পারে! মাদক হলো বহু গুরুতর অপরাধের জননী। সর্বনাশা মাদকের কারণে মানুষ তার মনুষ্যত্ব হারাচ্ছে, জাতি মেধাশূন্য হচ্ছে। মাদক কেনার অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়েই কিশোর-তরুণরা ব্যাপকভাবে নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। দেশের প্রতিদিনকার দৈনিকগুলোর পাতা খুললেই চোখে পড়ে মাদকের ভয়াবহতা। ভৌগোলিকভাবে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলের কারণে আমাদের দেশে নানাভাবে নানাপথে বানের জলের মতো মাদক প্রবেশ করে থাকে। যার সিংহভাগ আবার বিদেশে পাচার হয়ে যায়। অত্যন্ত লাভজনক এই ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিশাল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্র। শক্তিশালী এই চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ আমাদের দেশে সর্বস্তরে দুর্নীতির শাখ-প্রশাখা বিস্তৃত। ফলে যেকোনো অপরাধী বা মাদক কারবারিরা আড়ালে থেকে যায় নিজস্ব কৌশলে। আইন ও সরকার এদের প্রভাবের কাছে নতজানু। সরকার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর প্রতিষ্ঠা করে দেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ গ্রহণ করলেও তাদের অর্জন যে কিছু একটা হয়েছে তা মনে হয় না। তাই মাদকের অভিশাপ থেকে দেশকে বাঁচাতে সরকারের পাশাপাশি সামাজিক নেতাদের এগিয়ে আসতে হবে। সামাজিকভাবে প্রতিরোধই পারে পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে মাদককে না বলার মতো শক্ত ভিত সৃষ্টি করতে।

সারা দেশের মাদকের সার্বিক চিত্র তুলে ধরলে আগ্রাসনের যে ভয়াবহতা প্রকাশ পাবে তা যেকোনো মানুষকেই উদ্বিগ্ন করে তুলবে। সাধারণ মানুষের ধারণা, মাদকের সর্বগ্রাসী রূপ আরো ব্যাপক। কারণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগা দিয়েই সিংহভাগ মাদকদ্রব্য আনাগোনা করে। এই মাদকের আগ্রাসন থেকে নারী-পুরুষ, কিশোর-যুবা কেউই মুক্ত থাকতে পারছে না। বেকারত্ব ও হতাশা থেকে মানুষ সঙ্গদোষে মাদকাসক্ত হচ্ছে। বস্তি থেকে শুরু করে সমাজের উচ্চ শ্রেণি পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছে মাদক। এখন নারীরাও পিছিয়ে থাকছে না। একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকা শহরের নামিদামি মহিলা কলেজসহ বিভিন্ন কলেজের পাঁচ সহস্রাধিক ছাত্রী মাদকাসক্ত। এই ব্যাপকতার পাশাপাশি নেশার জগতে নতুন নতুন মাদকদ্রব্যের সংযোজন ঘটছে। এতদিন নেশার জগতে রাজা হয়ে বসেছিল হেরোইন আর এখন মাদকসেবীরা নতুন রানীর সন্ধান পেয়েছে। তরুণ-তরুণীর ভাষায় ইয়াবা হচ্ছে ‘দ্য কুইন’। আমাদের তরুণ শিক্ষার্থীরা জানে মারাত্মক উত্তেজনা সৃষ্টিকারী ইয়াবাকে মাদক হিসেবে ব্যবহার করলে মস্তিষ্কের রক্তবাহী নালিগুলো ধ্বংস হয়। ফলে ব্রেন স্ট্রোক ঘটতে পারে। নেশার প্রতিক্রিয়া কোকেনের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বলে সব জানার পরও এটার প্রতি সবার নজর। এই সর্বনাশা মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে কিশোর-তরুণরা ব্যাপকভাবে নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। মাদকের টাকা না পেয়ে খুন-জখমের ঘটনা ঘটছে। এমন অবস্থা থেকে নিকটজনরাও বাঁচতে পারছে না।

দেশে অবৈধ মাদকপ্রবাহ রোধ, মাদক পরিবহন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিতকরণ এবং মাদকের কুফল সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সরকার একক দায়িত্বে মাদকের অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে পারবে না। সমাজকে নেতৃত্বদানকারী মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। এ নেতৃত্বদানকারীরা যদি মাইন্ড সেট করে তারা মাদকের অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্ত করবে, তবে সম্মিলিত উদ্যোগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হতে পারে। মাইন্ড সেট হলেই নির্ভীকভাবে লক্ষ্য অর্জনের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। সামাজিক প্রতিরোধের পাশাপাশি পরিবারকেও এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি পরিবারে বাবা-মা দুজনকেই তাদের সময়ের একটা নির্দিষ্ট অংশ সন্তানদের জন্য বরাদ্দ করতে হবে। আমাদের সাধারণ পরিবারগুলোতে মায়ের ওপর একক দায়িত্ব বর্তায়। এটা করলে হবে না। বাবা-মা উভয়কে সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ করতে হবে। এই সময় ও আচরণ পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে সহায়ক হবে। এই পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হলেই পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হবে। তাতে করে আনন্দ-বেদনা ভাগাভাগি করার এবং নিজেদের অসুবিধাগুলো সমাধানের পথ পাওয়া যায়। সরকার আইনি সহায়তা দেবে আর সমাজ ও পরিবার হতাশা এবং অবক্ষয় কমানোর দায়িত্ব পালন করবে। বাবা-মা পারে প্রাথমিকভাবে সন্তানকে মাদকের গ্রাস থেকে রক্ষা করতে। ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করলে, তবেই মিলতে পারে মুক্তির পথ। সরকারের পাশাপাশি সমাজ মানবিক হাত বাড়িয়ে দিলে জাতি মাদকের ছোবল থেকে মুক্তি পাবে। অপরদিকে ছাত্র-ছাত্রী তথা আমাদের তরুণ সমাজ জাতির বড় সম্পদ। তারা বড় হয়ে নিজেদের মেধা ও চরিত্র দিয়ে দেশকে অনেক কিছু দেবে বা জাতিকে উচ্চ শিখরে নিয়ে যাবে-এটাই আমাদের স্বাভাবিক প্রত্যাশা। সেই শিক্ষার্থীরা, সেই তরুণ প্রজন্ম পথভ্রষ্ট হয়ে যদি মাদকাসক্তির মতো অনৈতিক ঘৃণ্যকর্মে লিপ্ত হয়ে সন্ত্রাস, দুর্নীতিসহ নানা অপকর্মে নিজেদের নিয়োজিত করে, তবে দেশের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে তা অতি সহজেই অনুমেয়। মাদকাসক্তির জঘন্য প্রবণতা ব্যক্তির শারীরিক ও সামাজিক ক্ষতি করার পাশাপাশি তার জীবনের সব সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেয়। বস্তুত এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি জীবন থেকে জীবন কেড়ে নেয়। যে পরিবারে একজন মাদকাসক্ত রয়েছে সে পরিবারের দুঃখ-দুর্দশার সীমা থাকে না।

মাদক ও মাদকাসক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখে এমন দশ শ্রেণির লোকের প্রতি রাসূল (সা.) অভিশম্পাত করেছেন।
১. যে লোক মদের নির্যাস বের করে।
২. প্রস্তুতকারক।
 ৩. মদপানকারী।
৪. যে পান করায়।
৫. মদের আমদানিকারক।
৬. যার জন্য আমদানি করা হয়।
৭. বিক্রেতা।
৮. ক্রেতা।
৯. সরবরাহকারী এবং
১০. মাদক ব্যবসায় লভ্যাংশ ভোগকারী। তাই, আসুন-সর্বগ্রাসী মাদকের বিরুদ্ধে নিজে সতর্ক হই, পরিবারকে সচেতন করি। পাশাপাশি অন্যদেরও মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে এগিয়ে আসি। এবং একই সঙ্গে সরকারের ভেতরে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা মাদক স¤্রাটদের প্রতি কঠোর আচরণের মধ্য দিয়ে সরকারকে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করতে হবে। অন্যথায় এর সমাধান কখনোই সম্ভব নয় বলেই সবার ধারণা।

লেখক : কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিক
মুহাম্মদ কামাল হোসেন

No comments:

Post a Comment