মাদক ও আমাদের সমাজ


Monday, February 5, 2018

জীবন কুরে কুরে খায় নীল মাদক ইয়াবা





ভ্যানিলার ফ্লেভার, সবুজ বা লাল কমলা রঙ।

ইয়াবা নামের ছোট্ট ট্যাবলেটটি দেখতে অনেকটা ক্যান্ডির মতো, স্বাদেও তেমনি মজাদার। তরুণ তরুণীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে মূল উপাদানের সঙ্গে মেশানো হয় আঙুর, কমলা বা

ভ্যানিলার ফ্লেভার, সবুজ বা লাল কমলা রঙ। ফলে আসক্ত ব্যক্তিরা

এর প্রচন্ড ক্ষতিকর প্রভাবটুকু

প্রথমে বুঝতে পারে না। একই

কারণে এটি পরিবহন করা ও

লুকিয়ে রাখাও সহজ।

ইয়াবা আসলে কী জিনিস

এর মূল শব্দ থাই থেকে উত্পত্তি। সংক্ষিপ্ত অর্থ পাগলা ওষুধ। অনেকে একে বলে 'ক্রেজি মেডিসিন'। মূল উপাদান মেথঅ্যামফিটামিন।

আসলে ইয়াবা নেশা জাতীয় ওষুধ। এক ভয়াবহ মাদক যা মস্তিষ্ক,

হূদযন্ত্র এবং শরীরের যে কোনো অঙ্গকেই আক্রান্ত করতে পারে।

ধীরে ধীরে অকেজো করে দেয়

একটি সুন্দর দেহ, মন ও মানসিকতার। ইয়াবা আসক্তির কারণে মস্তিষ্কের বিকৃতি হতে পারে। মাঝে মাঝে ইয়াবার সঙ্গে ক্যাফেইন বা হেরোইন মেশানো হয়, যা আরও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটি এক সময় সর্দি ও নাক বন্ধ হয়ে যাওয়ার ওষুধ হিসেবে ব্যবহূত হতো কোনো কোনো দেশে। আরো ব্যবহার করা হতো ওজন কমানোর ওষুধ হিসাবে। পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষ বিশেষত শিক্ষার্থী, দীর্ঘ যাত্রার গাড়ি চালক ও দৌড়বিদরা এটি ব্যবহার শুরু করেন। ধীরে ধীরে এর কুফল বা দীর্ঘ মেয়াদি ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া উদঘাটিত হতে থাকায় বিশ্বব্যাপী এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির সেনাদের নিদ্রা, ক্ষুধা ও ক্লান্তিহীন করার জন্য ইয়াবা জাতীয় ওষুধ খাওয়ানো হতো। বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ক্লন্তি দূর করতে ও সজাগ থাকতে সেনাদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল মেথঅ্যামফিটামিন। সেনারা হতো হিংশ্র, ক্লান্তিহীন ও আগ্রাসী। কিন্তু একবার আসক্ত হয়ে যুদ্ধ ফেরত সেনারা মানসিক অবসাদ গ্রস্ততায় ভুগত এবং আরও হিংশ্র হয়ে উঠত। এক সেনা আরেক সেনাকে গুলি করে মারত, আবার কখনো নিজে আত্মহত্যা করত।

ইয়াবার আনন্দ আর উত্তেজনা আসক্ত ব্যক্তিদের সাময়িকভাবে ভুলিয়ে দেয় জীবনের সব যন্ত্রণা। তারা বাস করে স্বপ্নের এক জগতে। এই ভয়ানক মাদক সেবন করলে মনে উত্ফুল্ল ভাব তৈরি হয়, মুড হাই হয়ে যায়। এমনকি ইয়াবার প্রচন্ড উত্তেজক ক্ষমতা আছে বলে যৌন উত্তেজক হিসেবে অনেকে ব্যবহার করে এটি। এতে যৌন উত্তেজনা বেড়ে যায়, মনে উত্তেজনা আসে। তাই অনেক যুবক যুবতীরা কৌতূহল বশত ইয়াবা সেবন করে থাকে। ক্ষুধা কমিয়ে দেয় বলে স্লিম হওয়ার ওষুধ হিসেবে অনেকে শুরু করে ইয়াবা সেবন। কিছুটা ওজন কমে। ঘুম কমিয়ে দেয়, সারা রাতের পার্টির আগে ক্লান্তিহীন উপভোগ নিশ্চিত করতে অনেকের পছন্দ ইয়াবা। তবে সবগুলোই সাময়িক। কিন্তু সাময়িক আনন্দের এই ভয়ানক ট্যাবলেটটি যে তাদের ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে, তা টের পাওয়ারও অবকাশ সে সময় তাদের আর থাকে না। দেখা যায়, কিছুদিন ইয়াবা সেবনের পর শুরু হয় এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। কৌতূহল বশত: কয়েকদিন সেবনের পরই আসক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, এটি ছেড়ে দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন ইয়াবা ছাড়া আর কিছুই ভালো লাগে না। ওই মাদক পেতে যে কোনো হীন অপকর্ম করতেও হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। প্রথমে কম ডোজে এ ট্যাবলেট কাজ করলেও ধীরে ধীরে ডোজ বাড়াতে হয়। আগে যে পরিমাণ ইয়াবা আনন্দ এনে দিত, পরে তাতে আর হয় না। বাড়তে থাকে ট্যাবলেটের পরিমাণ, ক্ষণস্থায়ী আনন্দের পর বাড়তে থাকে ক্ষতিকর নানা উপসর্গও। প্রথমেই শুরু হয় মানসিক অবসাদ গ্রস্থতা। শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়তে থাকে, মেজাজ হয় খিটখিটে, গলা মুখ শুকিয়ে আসতে থাকে, অনবরত প্রচন্ড ঘাম আর গরমের অসহ্য অনুভূতি বাড়তে থাকে। বাড়ে নাড়ির গতি, রক্তচাপ, দেহের তাপমাত্রা আর শ্বাস প্রশ্বাসের গতি। দেহে আসে মানসিক অবসাদ, ঘুম না হওয়া এবং চিন্তা ও আচরণে বৈকল্য দেখা দেয়। মানুষ আর মানুষ থাকে না। হয়ে উঠে হিংশ্র, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। ন্যায় অন্যায় বোধ লোপ পায়। হয়ে উঠে অপরাধ প্রবণ। অনায়াসে মানুষ খুন করতেও দিদ্ধা বোধ করেনা। এক সময়ে শরীরের অন্যান্য অঙ্গও অকেজো হয়ে যায়।

ইয়াবা সেবিরা উচ্চ

রক্তচাপে ভোগে

দীর্ঘদিনের আসক্ত ব্যক্তিরা উচ্চ রক্তচাপে ভোগে। মস্তিষ্কের ভেতরকার ছোট রক্তনালিগুলো ক্ষয় হতে থাকে, এগুলো ছিঁড়ে অনেকের রক্তক্ষরণ শুরু হয়। স্মৃতিশক্তি কমে যায়, মানসিক নানা রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, অহেতুক রাগারাগি, ভাংচুরের প্রবণতা বাড়ে। পড়াশোনা, কর্মক্ষেত্র বা পারিবারিক জীবনে বিরূপ প্রভাব পড়ে। সর্বক্ষেত্রে ব্যর্থতা বা পিছিয়ে পড়তে থাকায় আসক্ত ব্যক্তিরা বিষন্নতায় আক্রান্ত হয়। কারও কারও মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয়। দৃষ্টি বিভ্রম, শ্রুতি বিভ্রম আর অস্বাভাবিক সন্দেহ প্রভৃতি উপসর্গ থেকে এক সময় জটিল মানসিক ব্যধিও দেখা দেয়। বেশি পরিমাণে নেওয়া ইয়াবা সেবনের

ফলে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের ব্যত্যয় ঘটিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে।

সামগ্রিক দৃষ্টিতে ইয়াবা সেবনের ক্ষতি অসীম ও অপূরণীয়ও

এটি পরিবারকে ধ্বংস করে। সমাজকে করে কলুষিত এবং দেশকে করে পঙ্গু। পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পরে। রাষ্ট্রের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়। এই মাদক জীবন থেকে জীবন এবং হূদয়ের আবেগ অনুভুতি কেড়ে নেয়। আলোর পথ ছেড়ে নিয়ে যায় অন্ধকার পথে। স্বাধীন হূদয় পরিণত হয় নেশার দাসে। ইয়াবার পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি আসক্ত ব্যক্তিরা এর ওপর শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। একবার ইয়াবা নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা বা নির্দিষ্ট সময় পর আবার না নিলে শরীরে ও মনে নানা উপসর্গ দেখা দেয়। ফলে বাধ্য হয়ে আসক্ত ব্যক্তিরা আবার ফিরে যায় নেশার জগতে।

প্রতিকার ও প্রতিরোধ

ইয়াবা আসক্তি প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ করা অনেক সহজ। সুতরাং প্রতিরোধের উপর বেশি মনোযোগ দিতে হবে। এই মাদকের আগ্রাসন থেকে দেশের যুব সমাজকে রক্ষা করতে প্রয়োজন সামগ্রিক প্রতিরোধ। আসক্ত ব্যক্তি, যিনি পুনরায় স্বাভাবিক সুস্থ জীবন ফিরে পেতে চায়, তাদের নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। এ কথা মোটেই সত্য নয় যে, তারা আর কখনোই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে

যেতে পারবে না। শুধু মাত্র

প্রয়োজন ধৈর্য সহকারে দীর্ঘমেয়াদি চিকিত্সা। একবার কেউ আসক্ত হয়ে গেলে তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার না করে ভালোভাবে বোঝাতে হবে,

যাকে বলে কাউন্সেলিং। কোনক্রমেই বকাবকি, তালাবদ্ধ করে রাখা যাবে না। চিকিত্সার জন্য রাজি করিয়ে

তার শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার চিকিত্সার পাশাপাশি মানসিক চিকিত্সার জন্য মনোরোগ চিকিত্সকের পরামর্শ নেওয়া জরুরী। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শে বিভিন্ন ধরনের চিকিত্সা পদ্ধতি আসক্ত ব্যক্তিদের আশার আলো দেখাচ্ছে। তারা ফিরে যেতে পারছে মাদকমুক্ত জীবনধারায়। ওষুধ, সাইকোথেরাপি ও অন্যান্য উপায়ে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবনযাপন পদ্ধতিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। পরিবর্তন করার চেষ্টা করা হয় তার আগের পারিপার্শিক পরিবেশ, যা তাকে মাদকাসক্ত হতে উদ্ধুদ্ধ করেছিল। এতে মানসিক রোগ চিকিত্সক ও মনোবিজ্ঞানীর যেমন ভূমিকা রয়েছে, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে পরিবার, আত্মীয়স্বজন আর প্রকৃত ভালো বন্ধুরও। একজন নেশাসক্ত ব্যক্তি সবার সম্মিলিত সহযোগিতায়ই আবার ফিরে পেতে পারে মাদকমুক্ত সুস্থ জীবন। আর প্রতিরোধ একক ভাবে কোনো ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ বা দেশের পক্ষে করা সম্ভব নয়। সবাইকে নিয়েই এই প্রতিরোধ যুদ্ধে নামতে হবে এবং এই যুদ্ধ চলমান রাখতে হবে। গড়ে তুলতে হবে মাদক প্রতিরোধ সামাজিক আন্দোলন।

দৃঢ় পারিবারিক বন্ধন ও সঠিক শিক্ষা মাদক প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রথমেই এসব দায়িত্ব বর্তায় পরিবারের উপর। আর সমাজ ও দেশের দায়িত্ব মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে ঘৃণা ও অপরাধী হিসেবে বড় করে না দেখে কোথা থেকে, কীভাবে, কারা মাদক সরবরাহকারী বা কারা এসবের মূল হোতা, তাদের বিচার ও শাস্তির আওতায় আনা। তবেই এই ভয়ানক ইয়াবার ছোবল থেকে আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম ও কোমলমতি সন্তানদের রক্ষা করা

সম্ভব হবে। তাই এখনই উচিত সবাইকে একতাবদ্ধ হয়ে মাদক বিরোধী স্লোগানে সোচ্চার হওয়া। মনে রাখতে হবে অপরাধী নয়, অপরাধই ঘৃণার বিষয়। স্বাভাবিক সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে তাদের প্রতি ঘৃণা নয়, বরং সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।

লেখক:ডীন, মেডিসিন অনুষদ

অধ্যাপক, মে ডিসিন বিভাগ

মাদক ও আমাদের সমাজ

বর্তমান সময়ে একটি সর্বগ্রাসী সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে মাদক। এটি একটি দেশ বা সমাজের অন্যতম মারাত্মক সমস্যা। বিশেষত আমাদের যুবসমাজের জন্য মাদক ও মাদকাসক্তি মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদকদ্রব্যের ব্যবহার ও চোরাচালান সমস্যা দেশ-কাল, ধর্ম-বর্ণ, সমাজ নির্বিশেষে আজ সারা বিশ্বকে গ্রাস করছে। ধনী-দরিদ্র, উন্নত-উন্নয়নশীল কোনো দেশই মাদক সন্ত্রাস থেকে মুক্ত নয়। প্রতিনিয়ত এর বিষাক্ত ছোবলে আক্রান্ত হচ্ছে অসংখ্য সম্ভাবনাময় জীবন। সমাজের যাবতীয় পাপাচার, অন্যায়, বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতার অধিকাংশের মূলেই রয়েছে এই মাদক ও মাদকাসক্তি। ইসলাম এই মাদক ও মাদকাসক্তির ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট সমাধান এবং পালনীয় নীতিমালা প্রদান করেছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ (ভাগ্য-নির্ধারক শর বলতে আরবে প্রচলিত এক ধরনের জুয়া বোঝানো হয়েছে) এসব শয়তানের কাজ বৈ অন্য কিছু নয়। অতএব, এগুলো থেকে দূরে থাক; যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও (সুরা মায়িদা-৯০)।

পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে মাদক ও সংশ্লিষ্ট সবকিছুকে শয়তানের জঘন্য কাজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং এও বলা হয়েছে যে, মাদক মানুষের মাঝে শত্রুতা ছড়িয়ে দেয়। বর্ণিত আয়াতে মাদকের আরেকটি ভয়াবহ পরিণতির কথা বলা হয়েছে, মাদক মানুষকে মহান আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। আর যখন কোনো মানুষ সম্পূর্ণভাবে আল্লাহবিমুখ হয়ে যায়, তখন তার মাঝে নীতি-নৈতিকতা বলতে কিছু অবশিষ্ট থাকে না। হযরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস, ‘রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, সকল নেশা জাতীয় দ্রব্যই খমর তথা মদের অন্তর্ভুক্ত। আর সব ধরনের মাদকই হারাম।’ (মুসলিম)। আবদুল্লাহ বিন উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, যদি কেউ মদপান করে, আল্লাহ তার চল্লিশ দিনের নামাজ কবুল করেন না। আর যদি এ অবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করে; তবে সে জাহান্নামি হবে। কিন্তু যদি সে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, আল্লাহ তায়ালা তাকে ক্ষমা করে দেবেন। এরপর যদি দ্বিতীয়বার মাদক গ্রহণ করে তাহলে তার চল্লিশ দিনের নামাজ কবুল হবে না। তবে যদি দ্বিতীয়বার তওবা করে, আল্লাহ তওবা কবুল করবেন। এরূপ যদি চতুর্থবার সে পুনরায় মদপান করে, তাহলে আল্লাহ তায়ালার ওপর হক হয়ে যায় যে তিনি তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন।’

হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস রয়েছে, ‘রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, মদ সব অশ্লীলতার মূল ও মারাত্মক কবিরা গুনাহ। এও বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি মদপান করল সে যেন আপন মা, খালা ও ফুফুর সঙ্গে অপকর্মে লিপ্ত হলো।’ (তবরানি)। মদের কুফল বর্ণনার ব্যাপারে এর চেয়ে মারাত্মক কথা আর কী হতে পারে! মাদক হলো বহু গুরুতর অপরাধের জননী। সর্বনাশা মাদকের কারণে মানুষ তার মনুষ্যত্ব হারাচ্ছে, জাতি মেধাশূন্য হচ্ছে। মাদক কেনার অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়েই কিশোর-তরুণরা ব্যাপকভাবে নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। দেশের প্রতিদিনকার দৈনিকগুলোর পাতা খুললেই চোখে পড়ে মাদকের ভয়াবহতা। ভৌগোলিকভাবে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলের কারণে আমাদের দেশে নানাভাবে নানাপথে বানের জলের মতো মাদক প্রবেশ করে থাকে। যার সিংহভাগ আবার বিদেশে পাচার হয়ে যায়। অত্যন্ত লাভজনক এই ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিশাল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্র। শক্তিশালী এই চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ আমাদের দেশে সর্বস্তরে দুর্নীতির শাখ-প্রশাখা বিস্তৃত। ফলে যেকোনো অপরাধী বা মাদক কারবারিরা আড়ালে থেকে যায় নিজস্ব কৌশলে। আইন ও সরকার এদের প্রভাবের কাছে নতজানু। সরকার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর প্রতিষ্ঠা করে দেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ গ্রহণ করলেও তাদের অর্জন যে কিছু একটা হয়েছে তা মনে হয় না। তাই মাদকের অভিশাপ থেকে দেশকে বাঁচাতে সরকারের পাশাপাশি সামাজিক নেতাদের এগিয়ে আসতে হবে। সামাজিকভাবে প্রতিরোধই পারে পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে মাদককে না বলার মতো শক্ত ভিত সৃষ্টি করতে।

সারা দেশের মাদকের সার্বিক চিত্র তুলে ধরলে আগ্রাসনের যে ভয়াবহতা প্রকাশ পাবে তা যেকোনো মানুষকেই উদ্বিগ্ন করে তুলবে। সাধারণ মানুষের ধারণা, মাদকের সর্বগ্রাসী রূপ আরো ব্যাপক। কারণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগা দিয়েই সিংহভাগ মাদকদ্রব্য আনাগোনা করে। এই মাদকের আগ্রাসন থেকে নারী-পুরুষ, কিশোর-যুবা কেউই মুক্ত থাকতে পারছে না। বেকারত্ব ও হতাশা থেকে মানুষ সঙ্গদোষে মাদকাসক্ত হচ্ছে। বস্তি থেকে শুরু করে সমাজের উচ্চ শ্রেণি পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছে মাদক। এখন নারীরাও পিছিয়ে থাকছে না। একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকা শহরের নামিদামি মহিলা কলেজসহ বিভিন্ন কলেজের পাঁচ সহস্রাধিক ছাত্রী মাদকাসক্ত। এই ব্যাপকতার পাশাপাশি নেশার জগতে নতুন নতুন মাদকদ্রব্যের সংযোজন ঘটছে। এতদিন নেশার জগতে রাজা হয়ে বসেছিল হেরোইন আর এখন মাদকসেবীরা নতুন রানীর সন্ধান পেয়েছে। তরুণ-তরুণীর ভাষায় ইয়াবা হচ্ছে ‘দ্য কুইন’। আমাদের তরুণ শিক্ষার্থীরা জানে মারাত্মক উত্তেজনা সৃষ্টিকারী ইয়াবাকে মাদক হিসেবে ব্যবহার করলে মস্তিষ্কের রক্তবাহী নালিগুলো ধ্বংস হয়। ফলে ব্রেন স্ট্রোক ঘটতে পারে। নেশার প্রতিক্রিয়া কোকেনের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বলে সব জানার পরও এটার প্রতি সবার নজর। এই সর্বনাশা মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে কিশোর-তরুণরা ব্যাপকভাবে নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। মাদকের টাকা না পেয়ে খুন-জখমের ঘটনা ঘটছে। এমন অবস্থা থেকে নিকটজনরাও বাঁচতে পারছে না।

দেশে অবৈধ মাদকপ্রবাহ রোধ, মাদক পরিবহন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিতকরণ এবং মাদকের কুফল সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সরকার একক দায়িত্বে মাদকের অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে পারবে না। সমাজকে নেতৃত্বদানকারী মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। এ নেতৃত্বদানকারীরা যদি মাইন্ড সেট করে তারা মাদকের অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্ত করবে, তবে সম্মিলিত উদ্যোগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হতে পারে। মাইন্ড সেট হলেই নির্ভীকভাবে লক্ষ্য অর্জনের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। সামাজিক প্রতিরোধের পাশাপাশি পরিবারকেও এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি পরিবারে বাবা-মা দুজনকেই তাদের সময়ের একটা নির্দিষ্ট অংশ সন্তানদের জন্য বরাদ্দ করতে হবে। আমাদের সাধারণ পরিবারগুলোতে মায়ের ওপর একক দায়িত্ব বর্তায়। এটা করলে হবে না। বাবা-মা উভয়কে সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ করতে হবে। এই সময় ও আচরণ পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে সহায়ক হবে। এই পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হলেই পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হবে। তাতে করে আনন্দ-বেদনা ভাগাভাগি করার এবং নিজেদের অসুবিধাগুলো সমাধানের পথ পাওয়া যায়। সরকার আইনি সহায়তা দেবে আর সমাজ ও পরিবার হতাশা এবং অবক্ষয় কমানোর দায়িত্ব পালন করবে। বাবা-মা পারে প্রাথমিকভাবে সন্তানকে মাদকের গ্রাস থেকে রক্ষা করতে। ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করলে, তবেই মিলতে পারে মুক্তির পথ। সরকারের পাশাপাশি সমাজ মানবিক হাত বাড়িয়ে দিলে জাতি মাদকের ছোবল থেকে মুক্তি পাবে। অপরদিকে ছাত্র-ছাত্রী তথা আমাদের তরুণ সমাজ জাতির বড় সম্পদ। তারা বড় হয়ে নিজেদের মেধা ও চরিত্র দিয়ে দেশকে অনেক কিছু দেবে বা জাতিকে উচ্চ শিখরে নিয়ে যাবে-এটাই আমাদের স্বাভাবিক প্রত্যাশা। সেই শিক্ষার্থীরা, সেই তরুণ প্রজন্ম পথভ্রষ্ট হয়ে যদি মাদকাসক্তির মতো অনৈতিক ঘৃণ্যকর্মে লিপ্ত হয়ে সন্ত্রাস, দুর্নীতিসহ নানা অপকর্মে নিজেদের নিয়োজিত করে, তবে দেশের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে তা অতি সহজেই অনুমেয়। মাদকাসক্তির জঘন্য প্রবণতা ব্যক্তির শারীরিক ও সামাজিক ক্ষতি করার পাশাপাশি তার জীবনের সব সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেয়। বস্তুত এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি জীবন থেকে জীবন কেড়ে নেয়। যে পরিবারে একজন মাদকাসক্ত রয়েছে সে পরিবারের দুঃখ-দুর্দশার সীমা থাকে না।

মাদক ও মাদকাসক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখে এমন দশ শ্রেণির লোকের প্রতি রাসূল (সা.) অভিশম্পাত করেছেন।
১. যে লোক মদের নির্যাস বের করে।
২. প্রস্তুতকারক।
 ৩. মদপানকারী।
৪. যে পান করায়।
৫. মদের আমদানিকারক।
৬. যার জন্য আমদানি করা হয়।
৭. বিক্রেতা।
৮. ক্রেতা।
৯. সরবরাহকারী এবং
১০. মাদক ব্যবসায় লভ্যাংশ ভোগকারী। তাই, আসুন-সর্বগ্রাসী মাদকের বিরুদ্ধে নিজে সতর্ক হই, পরিবারকে সচেতন করি। পাশাপাশি অন্যদেরও মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে এগিয়ে আসি। এবং একই সঙ্গে সরকারের ভেতরে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা মাদক স¤্রাটদের প্রতি কঠোর আচরণের মধ্য দিয়ে সরকারকে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করতে হবে। অন্যথায় এর সমাধান কখনোই সম্ভব নয় বলেই সবার ধারণা।

লেখক : কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিক
মুহাম্মদ কামাল হোসেন